রপ্তানির সুযোগ রেখে সমুদ্রে তেল গ্যাস অনুসন্ধানে হচ্ছে দরপত্র আহ্বান
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা (শনিবার, ২২৩শে মে ২০২৬):
সমুদ্রে তেল গ্যাস অনুসন্ধান শুরু করতে যাচ্ছে পেট্রোবাংলা। গভীর ও অগভীর সমুদ্রে ২৭টি ব্লকে অনুসন্ধানের জন্য রোববার আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হবে। রপ্তানির সুযোগসহ বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে আন্তর্জাতিক তেল গ্যাস কোম্পানির জন্য দেয়া হচ্ছে নানা সুবিধা। ৩০শে নভেম্বর দুপুর একটার মধ্যে দরপ্রস্তাব জমা দিতে হবে।
প্রতিবেশী দেশের সাথে সমুদ্রের সীমানা নির্ধারণ হলেও ১৬ বছরে সেখানের খনিজ সম্পদ আহরণ করতে পারেনি বাংলাদেশ। এই সময় সংকটের সাথে বেড়েছে আমদানি নির্ভরতা।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (পিএসসি) প্রকৌশলী মো. শোয়েব জানান, গতবার কেন কোম্পানিগুলো দরপ্রস্তাব জমা দেয়নি তা জানতে চেয়ে সেই অনুযায়ী চুক্তির খসড়া সংশোধন করা হয়েছে। এবার আশা করি ভালো সাড়া পাওয়া যাবে।
যেসব ব্লকের জন্য দরপত্র: পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, সমুদ্রের অগভীর এলাকায় ১২টি অর্থাৎ ০১, ০২, ০৩, ০৪, ০৫, ০৬, ০৭, ০৮, ০৯, ১০, ১১ ও ১৫ এবং গভীর সমুদ্রের ১৫টি অর্থাৎ ০৮, ০৯, ১০, ১১, ১২, ১৩, ১৪, ১৫, ১৬, ১৭, ১৮, ১৯, ২০, ২১, ২১ ও ২২ নম্বর ব্লকের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হচ্ছে।
রপ্তানির সুযোগ: বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে বিদেশী কোম্পানিকে দেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন সুবিধা। সমুদ্রে তেল বা গ্যাস পেলে বিদেশি কোম্পানি রপ্তানি করতে পারবে। তবে পেট্রোবাংলা যদি নিতে চাই অগ্রাধিকার পাবে। অর্থাৎ পেট্রোবাংলা না নিলে গ্যাস রপ্তানি করতে পারবে। পেট্রোবাংলা অথবা স্থানীয় ক্রেতা না পেলে রপ্তানি করতে পারবে। দেশের মধ্যেও চাইলে পেট্রোবাংলা ছাড়া অন্য কোনো কোম্পানির কাছে বিক্রি করতে পারবে।
তেলের সাথে সমন্বয় করে দাম: গ্যাস বা তেলের দাম নির্ধারণ হবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের সাথে সমন্বয় করে। তবে উচ্চ দাম এবং নিম্ন দাম নির্ধারণ করা থাকবে। আন্তর্জাতিক বাজারে যখন যে জ্বালানি তেলের দাম থাকবে সেই দামের গভীর সমুদ্রের জন্য ১১ শতাংশ হবে গ্যাসের দাম। অর্থাৎ প্রতিব্যারেল জ্বালানি তেলের দাম ১০০ ডলার হলে প্রতি এমএমসিএফডি গ্যাসের দাম হবে ১১ ডলার। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম এর চেয়ে বেশি হলেও কখনোই ১১ ডলারের বেশি দাম হবে না। আবার নিম্নে তেলের দাম যা থাক সাড়ে সাত ডলারের নিচে কখনোই গ্যাসের দাম নামবে না। অর্থাৎ সর্বোচ্চ ১১ এবং সর্বনিম্ন সাড়ে সাত ডলারের মধ্যে গ্যাসের দাম থাকবে। আর অগভীর সমুদ্রের জন্য সর্বোচ্চ দাম হবে ১০.৫০ ডলার।
কর দেবে পেট্রোবাংলা: কোম্পানিতে কর্মরত বিদেশিদের কর দিয়ে দেবে পেট্রোবাংলা। সাধারণত যেসব বিদেশি ব্যক্তি বাংলাদেশে চাকরি করে তাদেরকে কর্পোরেট কর দিতে হয়। কিন্তু এই চুক্তির আওতায় যে কাজ হবে সেখানে যারা চাকরি করবে তাদের ব্যক্তিকর পেট্রোবাংলা দিয়ে দেবে।
সময়: খসড়া চুক্তি অনুযায়ী, অনুসন্ধানের সময় মোট ৯ বছর। এর মধ্যে ভূতাত্ত্বিক জরিপ, দ্বিমাত্রিক বা ত্রিমাত্রিক জরিপ করতে হবে চার বছরের মধ্যে। তারপর খুব খননের সময় দেওয়া হবে দুই বছর। পরের তিন বছরের মধ্যে যেতে হবে উৎপাদনে।
বাধ্যবাধকতা: চুক্তি করার পর অবশ্যই সংশ্লিষ্ট আইয়ুসিকে ভূতাত্ত্বিক জরিপ করতে হবে। শুধু ভূতাত্ত্বিক জরিপ করায় বাধ্যবাধকতা করা হয়েছে।
ব্যাংক জমানত: দরপ্রস্তাব পর্যালোচনা করার পর কাজ পেলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে জরিপ করার আগেই ৩০ লাখ ডলার ব্যাংক জমানত দিতে হবে। তারপর কূপ খননের আগে দিতে হবে দুই কোটি ডলার। আবার গ্যাস বা তেল পাওয়া গেলে তা উত্তোলনের আগে দুই কোটি ডলার ব্যাংক জমানত দিতে হবে।
খরচ তুলে নেওয়া: বিদেশি কোম্পানি এখানে যত বিনিয়োগ করবে তা গ্যাস বা তেল বিক্রি থেকেই তুলে নেবে। পর্যায়ক্রমে বিনিয়োগের টাকা তুলতে হবে। বছরে খরচের ৭৫ শতাংশের বেশি নিতে পারবে না।
লভ্যাংশ বন্টন: খরচ বাদ দিয়ে যা থাকবে তা পেট্রোবাংলা এবং বিদেশি কোম্পানির মধ্যে ভাগ হবে। অগভীর সমুদ্রে পেট্রোবাংলার লাভের অংশ হবে ৪০ থেকে ৬৫ শতাংশের মধ্যে। আর গভীর সমুদ্রে ৩৫ থেকে ৬০ শতাংশের মধ্যে। বাকি গ্যাস বা তেলের অংশ পাবে বিদেশি কোম্পানি।
আমদানি শুল্ক মাফ: তেল গ্যাস অনুসন্ধান, উৎপাদন এবং উন্নয়নের সকল পর্যায়ে সকল যন্ত্রপাতি ও উপকরণ আমদানিতে শুল্ক মওকুফ থাকবে। অর্থাৎ কোনো কিছু আমদানিতে শুল্ক দেওয়া লাগবেনা।
শ্রমিক কল্যাণ তহবিল: শ্রম আইন অনুযায়ী বাংলাদেশে সকল বিনিয়োগকারীকে তার মোট লাভের ৫ শতাংশ শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে দিতে হয়। কিন্তু এই বিনিয়োগকারীদের শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে দেওয়া লাগবে মাত্র ১.৫ শতাংশ।
পাইপলাইনের খরচ: গ্যাস বা তেল পেলে তা আনতে যে পাইপলাইন করতে হবে সেই খরচ বিনিয়োগকারী বহন করবে। সে ক্ষেত্রে দূরত্ব, পানির গভীরতা এবং তেল বা গ্যাসের পরিমাণ বিবেচনায় রাখা হবে।
বাপেক্সের অংশ: অগভীর সমুদ্রে বাপেক্সের জন্য ১০ শতাংশ অংশ রাখা হয়েছে। তবে গভীর সমুদ্রে বাপেক্সের কোনো অংশ থাকবে না।
চুক্তির মেয়াদ: প্রাথমিকভাবে বিদেশি কোম্পানির সাথে গ্যাস ক্ষেত্রের জন্য ২৫ বছর আর তেল খনির জন্য ২০ বছরের চুক্তি করা হবে। তবে চাইলে তা আরও দশ বছর বাড়ানো যাবে।
সব প্রক্রিয়া শেষ করে ২০২৭ সালের শেষের দিকে সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান শুরু করা যাবে বলে আশা করছে পেট্রোবাংলা।
অন্তবর্তীকালীন সরকারের সময় দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। কিন্তু কয়েকটি কোম্পানি কিনলেও তা জমা দেয়নি।