গ্যাস বিদ্যুতের দাম না বাড়িয়ে অপচয় বন্ধ করুন

সম্পাদকীয়

গ্যাসের নতুন মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে। নতুন দাম নির্ধারণ মানেই বাড়বে। বিইআরসি’র বরাত দিয়ে এমন কথা জানিয়েছে সংবাদ মাধ্যম। এরমধ্যেই হয়ে গেল পাইকারি বিদ্যুতের দাম নিয়ে শুনানি। সেখানে পিডিবির পক্ষ থেকে ঘাটতির কথা বলা হয়েছে। বিইআরসি কারিগরি কমিটিও বলছে, ঘাটতি আছে। আর ঘাটতি সমন্বয় করতে প্রয়োজন ৫৮ শতাংশ বাড়ানো। তারমানে সেটাও বাড়ানোরই প্রক্রিয়া শুরু। আর পাইকারি বাড়লে ভোক্তাপর্যায়ে যে বাড়বে তা বলার অবকাশ নেই।
গ্যাস বিদ্যুতের দাম বাড়লে বহুমাত্রিক খরচ বাড়বে। জ্বালানি জোগাড় করতে তো খরচ বাড়বেই। সাথে অন্যান্য নিত্যপণ্রের খরচও বাড়বে। অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়বে। কৃষি, শিল্প উৎপাদন ও সেবা খাতের খরচ বাড়বে। মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেবে।
বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ মুহূর্তে বিদ্যুতের দাম বাড়ালে তা হবে আত্মঘাতী।
অর্থনীতি এখন নানামূখি সংকটে চলছে। আমদানি বেশি হচ্ছে। তাই বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয় কমে যাচ্ছে। আমদানি খরচ মেটাতে যে পরিমান বৈদেশিক মুদ্রা খরচ হচ্ছে সে পরিমান আয় হচ্ছে না। এতে সঞ্চয় কমে যাচ্ছে। এটা অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করছে। বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয় বাড়াতে অপ্রয়োজনীয় বেশকিছু পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই সমস্যা যে শুধু বাংলাদেশে তা নয়। উন্নয়নশীল ছোট ছোট অনেক দেশেই। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। আর পাঁচ মাসের মত বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয় আছে। তবে ঈদ উল আজহার সময় বেশি রেমিটেন্স আসবে। সাথে রপ্তানি থেকেও আয় হবে। এতে সমস্যার সমাধান হবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এইসব মিলেয়ে অর্থনীতিতে যে চাপ তা মেটাতে সরকার আয় বাড়াতে নানামূখি পদক্ষেপ নিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে সব কিছুর দাম বেশি। তাই আমদানিতে খরচ বাড়ছে। বিশেষ করে জ্বালানি আর সার আমদানিতে খরচ বেশি। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এত বেশি ভর্তুকি দেয়া সম্ভব নয়। ভর্তুকি কমাতে হবে। তারই অংশ হিসেবে বিদ্যুৎ গ্যাস আর সারের দাম বাড়ানোর সুপারিশ করেছে অর্থমন্ত্রণালয়।
সরকারের আয় বাড়াতে ফার্নেস অয়েলের শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। কয়লার ওপর ভ্যাট, গ্যাসের ওপর ডিমান্ড চার্জসহ বিদ্যুৎ বিক্রির ওপর উৎসে কর আরোপ করা হয়েছে। একদিকে ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে অন্যদিকে জ্বালানির ওপর বেশি করে করারোপ করা হয়েছে।
কিন্তু যে পরিস্থিতিই হোক সাধারণ মানুষের জীবন যাপনের কথা চিন্তা করে দাম না বাড়ানোর কথা বলছে শিল্প উদ্যোক্তারা। কারণ গ্যাস বিদ্যুৎ সারের দাম বাড়ালে জনমনে অস্থিরতা তৈরি হবে। আয় বাড়বে না, কিন্তু খরচ বাড়বে। সাধারণ নির্ধারিত আয়ের বা নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের কষ্ট বাড়বে।
ব্যবসায়ীরা বলছে, বৈশ্বিক করোনা মহামারি ও ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের ফলে বিশ্বব্যাপী আমদানি পণ্যের মূল্য বেড়েছে। এর প্রভাবে আমদানি খরচ বেড়েছে। একই কারণে উৎপাদন ব্যয়ও অত্যধিক বেড়ে গেছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের ওপর। এরসাথে গ্যাস বিদ্যুতের দাম বাড়ালে অবস্থা আরও খারাপ হবে। একইভাবে রপ্তানি শিল্পে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কষ্টকর হয়ে পড়ছে। এতে রপ্তানি কমে যেতে পারে। আর রপ্তানি কমলে তা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য আরও খারাপ হবে।
ক্যাবের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ জ্বালানি খাতে যে অব্যবস্থাপনা তা দূর করা গেলে ভর্তুকি প্রয়োজন হবে না। বিদ্যুৎ জ্বালানির ব্যবসায়, বিনিয়োগ, দাম নির্ধারণ সব কিছুতেই অসামঞ্জ্য আছে। এগুলো মেটালে অস্থিরতা থাকবে না। সিদ্ধান্তহীনতা আর কিছু মানুষের বিশেষ সুবিধা দিতে গিয়ে অপচয় বেশি হচ্ছে। সেই অপচয় আর সুবিধা দেয়া বন্ধ করতে হবে। তাহলে বিদ্যুৎ গ্যাসের দাম বাড়ানো প্রয়োজন হবে না।
প্রায় সকল পণ্যেও দাম বাড়ায় মানুষের ক্রয় ক্ষমতা কমেছে। আয় বাড়েনি কিন্তু খরচ বেড়েছে। এই অবস্থায় কোন ভাবেই গ্যাস বিদ্যুতের দাম বাড়ানো উচিত হবে না। বরং অপচয় কমানোর যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে।