রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি প্রবেশ শুরু
রফিকুল বাসার, ঈশ্বরদী, পাবনা থেকে:
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং শুরু হয়েছে, যা দেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত ধাপ হিসেবে বিবেচিত।
এটি বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক।
আগামী আগস্ট মাসে প্রথম ইউনিট থেকে পর্যায়ক্রমে তিনশ’ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হওয়ার কথা।
২০২৩ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর আকাশপথে রাশিয়া থেকে ঢাকায় পৌঁছায় পারমাণবিক জ্বালানির প্রথম চালান। এরপর আসে আরও কয়েকটি চালান। বিশেষ নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে সড়কপথে অক্টোবরে রূপপুরে নিয়ে যাওয়া হয় জ্বালানি। এরপর এটি মজুত করে রাখা হয়েছে রূপপুরে। অতিরিক্ত একটিসহ মোট ১৬৪টি বান্ডিল দেশে আনা হয়। রূপপুরে ব্যবহৃত প্রতিটি বান্ডিলে ৩১২টি জ্বালানি রড আছে ।
পাবনার ঈশ্বরদীতে বিদ্যুৎ কেন্দ্রর মধ্যে ফুয়েল লোডিং উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হন আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রসি। বাংলাদেশ নতুন মাইলফলক স্পর্শ করলো বলে মন্তব্য করেন তিনি। বলেন, এর মাধ্যমে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক উন্নয়নে আরও এগিয়ে যাবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী সব কার্যক্রম সম্পন্ন করা হচ্ছে। কারণ নিরাপত্তাই বাংলাদেশের প্রথম অগ্রাধিকার। এই পারমাণবিক কেন্দ্র ঢাকা ও মস্কোর মধ্যকার ঐতিহাসিক সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেবে।
রুশ পরমাণু শক্তি করপোরেশনের (রোসাটম) মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ বলেন, পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে বাংলাদেশকে যেভাবে সহযোগিতা করা হয়েছে, ভবিষ্যতেও সেভাবে পাশে থাকবে। বাংলাদেশের মানুষকে আশ্বস্থ করতে চাই নিরাপত্তা নিয়ে। সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও সর্বোচ্চ মানদন্ড বজায় রাখা হয়েছে। নিরাপদ পারমানবিক কেন্দ্র থেকেই সরবরাহ করা হবে বিদ্যুৎ। এমনকি বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ ভবিষ্যতের প্রয়োজনে সহযোগিতা থাকবে রোসাটমের।
প্রধানমন্ত্রীর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেন, আজকের দিনটি বাংলাদেশের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ । প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে বাংলাদেশ আরও একধাপ এগিয়ে গেল।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব আনোয়ার হোসেন বলেন, প্রযুক্তিগত রূপান্তরের সুযোগ এনে দিয়েছে রূপপুর। এই কেন্দ্র বাংলাদেশের বিজ্ঞান প্রযুক্তিকে আরও এগিয়ে নিবে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে ইউরেনিয়াম জ্বালানি প্রবেশের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ প্রবেশ করলো পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশের কাতারে। এর ফলে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের ৩৩তম দেশ, যারা ইউরেনিয়াম ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে যাচ্ছে।
এই প্রকল্পের মোট উৎপাদন ক্ষমতা ২৪০০ মেগাওয়াট, যা দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি দীর্ঘমেয়াদে নিরবচ্ছিন্ন ও স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই কেন্দ্র দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করবে এবং গ্যাস ও আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর চাপ কমাবে। একই সঙ্গে এটি অর্থনৈতিক উন্নয়নে নতুন গতি সঞ্চার করবে।
সব মিলিয়ে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র শুধু একটি প্রকল্প নয়—এটি বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে নতুন যুগের সূচনা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।