আমদানি নির্ভরতার কারণেই এতো লোডশেডিং?

সায়েদুল ইসলাম:

তীব্র গরম বাড়ার সাথে সাথে লোডশেডিং অনেক বেড়েছে। ঢাকাসহ সারা দেশে প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা করে বিদ্যুৎ থাকছে না।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জ্বালানি সংকটের কারণে চাহিদার সঙ্গে সরবরাহের বড় ঘাটতি। সবশেষ সেই তালিকায় যোগ হয়েছে কয়লাভিত্তিক পায়রা তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র। সর্বোচ্চ প্রয়োজনের সময় কয়লার অভাবে এই কেন্দ্রটি বন্ধ আছে।
বিদ্যুতের এই সংকটের জন্য আমদানি করা জ্বালানির ওপর অতি নির্ভরশীলতাকে দায়ী করেছেন বিশেষজ্ঞরা। ডলার সংকটের কারণে এসব কেন্দ্রের জ্বালানি আনা যাচ্ছে না।
আবহাওয়া পরিস্থিতির উন্নতি আর নতুন কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র দ্রুত সময়ে উৎপাদনে আসবেÑ তখন সংকট থাকবে না, বলছেন কর্মকর্তারা।
পরিস্থিতি এমন হওয়ার কারণ কী?
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের হিসেব অনুযায়ি বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ২৩ হাজার ৩৭০ মেগাওয়াট। তবে এই সক্ষমতা ২৪ ঘণ্টার জন্য নয়। বাস্তবে এক সাথে ১৫ হাজারের সামান্য বেশি কয়েক ঘণ্টার জন্য উৎপাদন করা যায়।
এসব কেন্দ্রের বেশিরভাগই গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল, যার মধ্যে দেশীয় এবং আমদানি দুটোই আছে। কয়লাভিত্তিক এবং তেল চালিত যেসব কেন্দ্র রয়েছে, সেগুলোর বেশিরভাগও আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম তামিম বলেন, এটা তো কাকতালীয়ভাবে হয়নি। চিন্তাভাবনা করেই আমদানি নির্ভর জ্বালানির নীতি নেওয়া হয়েছে। তখন ভাবা হয়েছিল, অর্থনৈতিকভাবে যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছিলাম, তখন বলা হয়েছিল যে, সেই অর্থনীতি এজন্য সহায়ক হবে। কিন্তু ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের ফলে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, এটা কারও চিন্তায় ছিল না।
তিনি জানান, পরিবেশের কথা ভেবে কয়লা উত্তোলন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সরকার। আর ১৯৯৯ সালের পর থেকে খুব বেশি গ্যাস অনুসন্ধান করা হয়নি। নানাবিধ কারণে কোন সরকারই সেটা করতে পারেনি। এমনকি আদালতের নিষেধাজ্ঞাও ছিল যে, বিদেশি কেউ এসে অনুসন্ধান করতে পারবে না।
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৫১ দশমিক ০৫ শতাংশ গ্যাস নির্ভর, ফার্নেস অয়েলের ওপর নির্ভরশীল ২৮ দশমিক ১৫ শতাংশ, ডিজেল চালিত কেন্দ্র থেকে ৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ আর কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে ৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ বিদ্যুৎ আসে।
বেসরকারি উদ্যোগে যে ৯ হাজার ৯৪৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা রয়েছে, এগুলো পুরোপুরি আমদানি করা জ্বালানি নির্ভর।
অধ্যাপক ম তামিম বলছেন, আমাদের জ্বালানির খুব বেশি মজুদ না থাকায় একসময় আমদানির দিকে যেতেই হতো, কিন্তু পাশাপাশি নিজস্ব জ্বালানি অনুসন্ধানের চেষ্টাটাও থাকা দরকার ছিল। সেটাই করা হয়নি, বরং অবহেলাই করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাস, তেল বা কয়লার দাম বাড়া বা কমার প্রভাব পড়ে দেশের বিদ্যুৎ খাতে। বিশেষ করে ইউক্রেন রাশিয়া যুদ্ধের পর থেকেই বিশ্ব বাজারে তেল, এলএনজি এবং কয়লার দাম বেড়ে যেতে শুরু করে। ফলে শুরুতে যেভাবে হিসাব করা হয়েছিল, সেই তুলনায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ অনেক বেড়ে যায়।
পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের কারণে এবং বাড়তি দামের কারণে বিশ্ব বাজার থেকে ডিজেল, এলএনজি এবং কয়লা কিনতেও হিমশিম খেতে শুরু করে সরকার।
বিদ্যুৎ খাত নিয়ে ২০১৬ সালে যে মহাপরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল, সেটা বিশ্লেষণ করলে ২০৩০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের জ্বালানির ৯০ শতাংশ আমদানি করতে হবে।
ডিজেল চালিত ১০টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে জাতীয় গ্রিডে ১২৯০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আসে। এর বাইরে ৬৪টি কেন্দ্রে ব্যবহার করা হয় ফার্নেস অয়েল, যেখান থেকে বিদ্যুৎ আসার কথা ৬ হাজার ৩২৯ মেগাওয়াট। এই দুটি মিলিয়ে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৩৪ শতাংশ।
এসব কেন্দ্র পুরোপুরি আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভর করে তৈরি করা হয়েছে। দেশে কিছু ফার্নেস অয়েল পাওয়া গেলেও তা পর্যাপ্ত নয়।
গ্যাস সংকট তৈরি হওয়ার পর বিদ্যুতের দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করতে কুইক রেন্টাল পদ্ধতিতে এসব কেন্দ্রের অনুমোদন দেয়া হয়েছিল। পরে উচ্চ দামের কারণে ডিজেল এবং ফার্নেস অয়েল-চালিত কিছু কেন্দ্র বন্ধ রাখা হয়। ফলে সেখানে প্রায় ১ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি তৈরি হয়। বসিয়ে রাখলেও এসব কেন্দ্রকে ক্যাপাসিটি চার্জ ঠিকই দিতে হচ্ছে।

গত ২০২০-২১ অর্থবছরেই ৩৭টি বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে বছরের অধিকাংশ সময় অলস বসিয়ে রেখে ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ ১৩ হাজার কোটি টাকা দিতে হয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বা পিডিবিকে।
দেশীয় গ্যাস নিয়েও টানাটানি
সংকটের মুখে পড়েছে গ্যাস চালিত কেন্দ্রগুলোও। যদিও বর্তমান সংকটের সময় এখনো এসব কেন্দ্র থেকেই বেশি বিদ্যুৎ আসছে।
গ্যাস চালিত ৫৭টি কেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা ১১ হাজার ৪৭৬ মেগাওয়াট। কিন্তু ঠিকমতো গ্যাস না পাওয়ায় এসব কেন্দ্র পুরো সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না।
প্রাকৃতিক গ্যাসের বিকল্প হিসাবে আমদানি করা এলএনজি দিয়ে পূরণের চেষ্টা করা হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে চড়া দামের কারণে এলএনজি আমদানিতেও ভাটা পড়েছে।
ম তামিম বলছেন, বাংলাদেশে ২০০৫ সাল থেকে গ্যাসের উৎপাদন কমে গেলেও সেই ধারা ধরে রাখার তেমন চেষ্টা করা হয়নি। বাপেক্সের বিনিয়োগে যে আর্থিক ঝুঁকি নেয়ার দরকার ছিল, হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগে শূন্য হাতে ফেরার যে ঝুঁকি ছিল, সেটা সরকারই নিতে চায়নি। ফলে দেশে নতুন গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কার হয়নি, বরং আমদানি করা গ্যাসের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ানো হয়েছে।
আরও যে ১০টি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে অথবা যে নয়টি কাজ চলমান, এর সবই জ্বালানি হিসাবে এলএনজি বা আমদানি করা গ্যাসের ওপর নির্ভর। কিন্তু বিশ্ব বাজারে এলএনজির চড়া দাম থাকলে এবং দেশে ডলার সংকটের সমাধান না হলে এসব কেন্দ্রের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
বাংলাদেশে বর্তমানে কয়লা-চালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র তিনটি। এর মধ্যে দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়ার বিদ্যুৎকেন্দ্রই একমাত্র, যা কিনা দেশীয় নিজস্ব খনির কয়লায় চলে। এটির মোট উৎপাদন ক্ষমতা ৫২৫ মেগাওয়াট।
বাকি যে দুইটি কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র চালু হয়েছে, তার একটি পায়রা, অন্যটি রামপাল। এই দুটি কেন্দ্রই আমদানি করা কয়লা নির্ভর।
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল, চট্টগ্রাম, মাতারবাড়ি, পটুয়াখালী এবং ঢাকায় যেসব কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণাধীন, এসব কেন্দ্রের জ্বালানিও আমদানি করতে হবে। কিন্তু ডলার সংকট না মিটলে সেখানেও ঝুঁকি দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র
নির্মাণাধীন একমাত্র পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রটি থেকে এই বছরের ডিসেম্বর নাগাদ বিদ্যুৎ পাওয়ার আশা করা হলেও সেটি সম্ভব হবে কিনা তা এখনো নিশ্চিত নয়। এই কেন্দ্রের পুরো জ্বালানিই রাশিয়া থেকে আসবে। এখান থেকে সর্বোচ্চ ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে।
বিকল্প কী?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনকার সংকট থেকে সরকারের নতুন করে বিবেচনা করার সময় এসেছে যে, জ্বালানির জন্য আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প কী ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম তামিম বলছেন, উচিত সৌর বিদ্যুতের জন্য বিশেষ পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাওয়া। তারা এদিকে গুরুত্ব বাড়িয়েছে, কিন্তু সেটা পুরোপুরি কাজ করছে বলে মনে হচ্ছে না। সেই সঙ্গে গ্যাস অনুসন্ধান আরও জোরদার করা দরকার। দেশীয় উৎস থেকে কিভাবে জ্বালানির ব্যবস্থা করা যেতে পারে, সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে।
কর্মকর্তারাও বলছেন, এই সংকটের পর তারাও ভাবতে শুরু করেছেন যে, কীভাবে দেশের ভেতর থেকে জ্বালানির উৎস খুঁজে বের করা যায়।
পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তার একটা পূর্বশর্ত হল, অভ্যন্তরীণ সম্পদের ওপর গুরুত্ব বাড়ানো। সেই ব্যবস্থাগুলো নিচ্ছি। সৌরের ওপর গুরুত্ব বাড়াচ্ছি, নতুন গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কার করছি। আমদানির পাশাপাশি নিজস্ব সম্পদও কাজে লাগাচ্ছি।
বর্তমান সংকটের বিষয়ে তিনি বলছেন পায়রা তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হলেও অন্য কয়েকটি উৎস থেকে বিদ্যুৎ যোগ করা হয়েছে।
১৩ই জুন থেকে এস আলমের একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রে উৎপাদন শুরু হবে, ২২শে জুন থেকে পায়রা আবার উৎপাদনে যাবে, আদানি পাওয়ার থেকে ডাবল ইউনিটের ১৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আসতে শুরু করবে। এসব কারণে এই মাসের শেষ নাগাদ পরিস্থিতি প্রায় স্বাভাবিক হয়ে যাবে বলে তিনি আশা করছেন।


লেখক: বিবিসি নিউজ বাংলা