কপ৩০: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তিতে অনেক ফারাক
রফিকুল বাসার, বেলেম, ব্রাজিল থেকে:
প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির অনেক ফারাক রেখেই শেষ হলো বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনের ৩০তম আসর।
ব্রাজিলে বিশ্ব জলবায়ু আলোচনা শনিবার শেষ হলো একটি অত্যন্ত দুর্বল চুক্তির মাধ্যমে। যেখানে পৃথিবীকে ভয়ঙ্করভাবে উত্তপ্ত করে তুলছে এমন জীবাশ্ম জ্বালানির কোনও সরাসরি উল্লেখই নেই।
ব্রাজিলের বেলেম শহরে নভেম্বরের ১০ তারিখে শুরু হওয়া সম্মেলনে বাধ্যতামূলক কোন সিদ্ধান্তে যায়নি উন্নত বা জীবাশ্ম জ্বালানি সরবরাহ করা দেশগুলো।
শেষ মুহূর্তে কিছু হবে বলে যে আশা ছিল- আগুনের ঘটনায় তাও ছাইয়ে চাপা পড়ে গেছে।
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা কপ৩০ কে আমাজন জঙ্গলের প্রেক্ষাপটে ইতিহাস গড়ার সুযোগ হিসেবে দেখেছিলেন—যে বন পৃথিবীর উষ্ণায়ন রোধে বিশাল ভূমিকা রাখে।
বেলেম চুক্তি:
বেলেম এর চূড়ান্ত নথিতে দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে যে, তারা তাদের জলবায়ু পরিকল্পনা ‘দুবাইয়ের সিদ্ধান্তগুলো বিবেচনায় নিয়ে’ বাস্তবায়ন করবে। ইউরোপিয়ান কূটনীতিকরা বলেছেন, এই কোডেড ভাষাটিও তাদের কাছে একটি ছোট অর্জন।
তাঁর আশা ছিল জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে বের হয়ে আসার একটি পথনকশা তৈরি হবে। শেষ পর্যন্ত তেমন কিছুই হলো না।
চুক্তিতে জলবায়ু দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে রক্ষার জন্য তহবিল বৃদ্ধি করার প্রতিশ্রুতি রাখা হয়েছে। ছোট দ্বীপ রাষ্ট্রগুলো বিশেষ করে চাইছিল যে অভিযোজন অর্থায়ন তিনগুণ বাড়ানোর নিশ্চয়তা থাকুক। চূড়ান্ত নথিতে ২০৩৫ সালের মধ্যে অভিযোজন অর্থায়ন “অন্তত তিনগুণ” করার আহ্বান রাখা হয়েছে।
ধরিত্রী রক্ষায় সিদ্ধান্তের জন্য আবারও অপেক্ষা আগামী ৩১তম আসরের দিকে অর্থাৎ তার্কিতে।
২১শে নভেম্বর সম্মেলন শেষ হওয়ার কথা থাকলেও অর্ধেক বেলা বাড়িয়ে ২২শে নভেম্বর দুপুর পর্যন্ত করা হয়।
আগুনের ঘটনায় ২১ নভেম্বর প্যাভিলিয়নগুলো ছিল বন্ধ। অংশগ্রহণকারীদের উপস্থিতিও কম। মিটিং রুমগুলো খোলা থাকলেও তেমন কোনো অংশগ্রহণকারী ছিল না।
জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকগুলোর একটি কপ। এটি কেবল আলোচনা নয়- বরং অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, খাদ্য, সামাজিক ন্যায়বিচার ও নতুন প্রযুক্তি—সব ক্ষেত্রেই বড় পরিবর্তনের সংকেত।
নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে কূটনীতিকরা চূড়ান্ত বিবৃতির ব্যাপকভাবে সমালোচনা করেছেন। নিউ ইয়র্ক টাইমস বলছে, সৌদি আরব ও রাশিয়ার মতো তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জন্য একটি বড় জয় হয়েছে। কিন্তু বিপজ্জনকভাবে বাড়তে থাকা বৈশ্বিক তাপমাত্রা মোকাবিলায় কীভাবে পদক্ষেপ নেওয়া হবে—সেই বিষয়ে প্রায় কোনও ব্যবহারিক নির্দেশনা নেই।
তেল, গ্যাস এবং কয়লার ব্যবহার দ্রুত বন্ধ না করলে প্রাণঘাতী তাপপ্রবাহ, খরা, বন্যা ও দাবানলের মতো ধ্বংসাত্মক প্রভাব আরও বাড়বে বলে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন।
শুক্রবার রাতভর একাধিক টানটান বৈঠক হয়েছে। এতে শেষ পর্যন্ত আমাজনের পাশে অবস্থিত বেলেমে বৈঠকটিকে সম্পূর্ণ ভেস্তে যাওয়া থেকে রক্ষা করেছে।
সৌদি আরবের মতো তেল রপ্তানিকারক দেশগুলো জোর দিয়ে বলেছিল যে তাদের প্রধান রপ্তানি পণ্যের বিরুদ্ধে কোনো নির্দেশনা রাখা যাবে না। আফ্রিকা ও এশিয়ার অনেক দেশও তাদের সঙ্গে যোগ দেয়, যারা বারবার যুক্তি দিয়েছে যে পশ্চিমা দেশগুলোর উচিত জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য বেশি দায়ভার নেওয়া, কারণ ইতিহাসে তারা সবচেয়ে বেশি গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ করেছে।
প্রায় ৮০টি দেশ—অথবা মোট অংশগ্রহণকারীর অর্ধেকের কিছু কম—জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা দাবি করেছিল। ইউরোপের বাইরে বড় অর্থনীতিগুলোর কেউই এ দাবির সঙ্গে একমত ছিল না।
চুক্তি পাশ হবার পর আলোচনার নেতৃত্বে থাকা ব্রাজিলিয়ান কূটনীতিক আন্দ্রে করেয়া দো লাগো ঘোষণা করেন যে ব্রাজিল একটি স্বাধীন রাজনৈতিক উদ্যোগ শুরু করবে, যাতে দেশগুলোকে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে উত্তরণের নির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বন রক্ষার পরিকল্পনায় একত্রিত করা হবে। যদিও এর কোনো আন্তর্জাতিক আইনি ক্ষমতা থাকবে না, তবুও উপস্থিত প্রতিনিধিরা সৌজন্যমূলক করতালিতে তা স্বাগত জানান।
তারপরই আপত্তির স্রোত শুরু হয়। প্রথমে পানামা, তারপর কলোম্বিয়া, তারপর ইউরোপীয় ইউনিয়ন। একে একে কূটনীতিকেরা বললেন তারা ফলাফলে অত্যন্ত হতাশ।
বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণকারী দেশ চীন বেলেমে খুব সীমিত ভূমিকা রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অনুপস্থিতির জায়গা পূরণে কোনো নেতৃত্ব দেখায়নি।
চীন নবায়নযোগ্য শক্তির দুনিয়ায় আধিপত্য বিস্তার করলেও আলোচনার প্রধান বিষয়গুলো—নিঃসরণ হ্রাস, দরিদ্র দেশগুলোর জন্য অর্থায়ন এবং বন ধ্বংস রোধে ব্রাজিলের নতুন তহবিল—এসব বিষয়ে শক্ত অবস্থান এড়িয়ে গেছে। চীনের চাপেই চুক্তিতে বলা হয়েছে যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সীমিত করতে জলবায়ুকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।
জলবায়ু লক্ষ্য বাড়ালে অর্থনীতিও বাড়ে:
ইউএনডিপি এক প্রতিবেদনে দেখিয়েছে—যদি দেশগুলো আরও উচ্চাভিলাষী জলবায়ু লক্ষ্য নেয়, তাহলে ২০৫০ সালে বিশ্ব অর্থনীতি ৩ শতাংশ বাড়বে।
আর ২১০০ সালে বাড়তে পারে ১৩ শতাংশ পর্যন্ত।
অর্থাৎ পরিবেশ রক্ষার কাজ অর্থনীতিরও উপকার করে।
জলবায়ু ও স্বাস্থ্য একসাথে:
কপ৩০-এ ৩০০ মিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল গঠন হয়েছে, যা জলবায়ু সমস্যা ও মানুষের স্বাস্থ্যের ঝুঁকি একসঙ্গে মোকাবিলা করবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও ব্রাজিল ‘বেলেম হেল্থ এন্ড ক্লাইমেট একশন প্লান’ ঘোষণা করেছে। সেখানে স্বাস্থ্য খাতে অর্থায়নের বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়েছে।
খাদ্য অপচয় কমানোর উদ্যোগ:
জাতিসংঘের সংস্থা পিএনইউএমএ ঘোষণা করেছে— ২০৩০ সালের মধ্যে খাদ্য অপচয় অর্ধেকে নামানো হবে। এতে মিথেন নির্গমনও কমবে।
বিশ্বে বছরে ১ বিলিয়ন টনের বেশি খাবার নষ্ট হয়—তাই এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
কৃষি ও খাদ্য পদ্ধতি ট্রান্সফরমেশন ঘোষণায় আরও ২০টির বেশি দেশ যুক্ত হয়েছে।
আদিবাসীদের অংশগ্রহণ:
হাজারও আদিবাসী প্রতিনিধি কপ৩০-এ অংশ নেয়।
তাদের অভিজ্ঞতা ও ভূমি রক্ষার জ্ঞান জলবায়ু আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। এটিকে ঐতিহাসিক হিসাবে বিবেচনা করছেন অনেকে।
নির্দিষ্ট নয় তবু কিছু অর্জন:
জলবায়ু অর্থায়নে সিদ্ধান্ত না হলেও কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে।
মূল খসড়া তাপমাত্রা ১.৫° সেলসিয়াস বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি আবার নিশ্চিত করা হয়েছে।
নতুন গ্লোবাল ক্লাইমেট ফাইন্যান্স গোল (এনসিকিউজি) -এর টেক্সটে অগ্রগতি—“কমপক্ষে ট্রিলিয়ন-স্কেল” অর্থায়নের দিকনির্দেশ পাওয়া গেছে।
উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সহায়তার পরিমাণ, পূর্বাভাসযোগ্যতা ও অ্যাক্সেসিবিলিটি বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে উন্নত দেশগুলো।
লোকসান ও ক্ষতি তহবিলে অতিরিক্ত অর্থ দেওয়া প্রতিশ্রুতি দিয়েছে অনেক দেশ। এই কাতারে আরও দেশ যুক্ত হয়েছে। যদিও প্রয়োজনের তুলনায় তা খুবই অপ্রতল।
প্রথমবারের মতো অ্যাডাপ্টেশন-এর জন্য গ্লোবাল ইন্ডিকেটর সেট নিয়ে রাজনৈতিক সম্মতি হয়েছে।
দেশগুলোকে ২০২৭ সালের মধ্যে অ্যাডাপ্টেশন প্রগ্রেস প্রতিবেদন বাধ্যতামূলক করার বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে।
প্যারিস চুক্তির দ্বিতীয় ধাপের পথনকশা হয়েছে।
ট্রপিক্যাল ফরেষ্ট ফরেভার ফেসালিটি –এর রূপরেখা ঘোষণা করা হয়েছে। এটা বনভূমি রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদী অর্থায়ন নিশ্চিতে নতুন জানালা তৈরি হয়েছে।
বন সংরক্ষণ উদ্যোগ ট্রপিকাল ফরেস্টস ফরএভার ফ্যাসিলিটি—২৫ বিলিয়ন ডলার তহবিলের লক্ষ্য ছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত জোগাড় হয়েছে মাত্র ৫ বিলিয়ন ডলার, নরওয়ে, ইন্দোনেশিয়া ও ফ্রান্সের মতো কয়েকটি দেশের প্রতিশ্রুতি থেকে। জার্মানি জানিয়েছে তারাও কিছু দেবে।
আমাজনের ৮টি দেশ যৌথভাবে ‘ডিফরেস্টেশন – ফ্রি ২০৩৫’ ঘোষণা করেছে।
জ্বালানি রূপান্তরে স্পষ্ট দিকনির্দেশ এসেছে। ২০২৩ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি তিনগুণ বাড়াতে আরও দেশ যুক্ত হয়েছে। জীবাশ্ম জ্বালানিতে ভর্তুকি কমাতে রাজনৈতিকভাবে নিশ্চয়তা দিয়েছে অনেক দেশ।
জীবাশ্ম জ্বালানি কামানোর প্রতিশ্রুতি:
দুই বছর আগে দুবাইয়ের সম্মেলনে দেশগুলো ২০৫০ সালের মধ্যে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে বের হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের আলোচকেরা জীবাশ্ম জ্বালানি নিয়ে স্পষ্ট পথনকশা চেয়েষছিলেন। কিন্তু বহু উন্নয়নশীল দেশ যুক্তি দিয়েছিল যে তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল পশ্চিমা দেশগুলোর কাছ থেকে জলবায়ু ক্ষতির মোকাবিলায় বড় পরিমাণ অর্থায়নের নিশ্চয়তা পাওয়া।
এই দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি হওয়া উচিত যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের। কারণ শিল্পবিপ্লবের পর থেকে তাদের নিঃসরণই সবচেয়ে বড়। একাই যুক্তরাষ্ট্র ইতিহাসে মোট নিঃসরণের প্রায় এক-চতুর্থাংশের জন্য দায়ী।
ক্লান্ত প্রতিনিধিদের সামনে অপেক্ষা করছিল দীর্ঘ যাত্রা। বেলেম, যদিও প্রাণবন্ত, তবুও অন্য মহাদেশের প্রতিনিধিদের জন্য ছিল ব্যয়সাপেক্ষ এবং দূরবর্তী। প্রায় ৫০ হাজার অংশগ্রহণকারীকে রাখতে যথেষ্ট হোটেলও ছিল না। অনেকেই ইউরোপ থেকে আনা দুটি ক্রুজ শিপে ছিলেন, আর অনেকে স্থানীয়দের ঘরে ঠাঁই নিয়েছেন।
বৈঠকের জন্য নির্মিত স্থানটি প্রতিনিধি আগমনের কয়েকদিন আগেই তৈরি হয়। প্রায় প্রতিদিনের ভারী বৃষ্টিতে তার দুর্বল দেয়াল কাঁপছিল, পানি ঢুকছিল আলোচনার ঘরে, বজ্রধ্বনি প্রতিনিয়ত ভীতি ধরাচ্ছিল। বৃহস্পতিবার, আলোচনার চরম পর্যায়ে, হঠাৎ আগুন লাগে, ১৩ জন ধোঁয়া শ্বাস নেওয়ায় হাসপাতালে যায়, এবং আলোচকরা উবারের ভেতরেই একে অপরের সঙ্গে কূটনীতি চালান।
শেষ পর্যন্ত আলোচনাগুলো আটকে যায় বড় নিঃসরণকারী দেশগুলো এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান দূরত্বে।
দশ বছর আগে প্যারিস চুক্তিতে প্রায় ২০০ দেশ সম্মত হয়েছিল যে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে এবং আদর্শভাবে ১.৫ ডিগ্রির কাছাকাছি রাখতে হবে।
যদিও কিছু অগ্রগতি হয়েছে, ২ ডিগ্রির লক্ষ্য এখন প্রায় অসম্ভব। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী বর্তমান নীতি অনুসারে এই শতাব্দীর শেষে পৃথিবী গরম হবে প্রায় ২.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
২০১৫ সালের পর নিঃসরণ আরও বেড়েছে। এ বছর জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছাবে। পৃথিবী ইতোমধ্যে ১৯শ শতকের শেষের তুলনায় প্রায় ১.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি গরম।
বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, আরও সামান্য উষ্ণতাও জলবায়ুকে অনেক অস্থির এবং দুর্যোগপ্রবণ করে তুলবে—যা কৃষি, শহর পরিকল্পনা ও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় গভীর প্রভাব ফেলবে।