অপরিশোধিত জ্বালানি তেল না থাকায় চট্টগ্রামের একমাত্র শোধনাগার বন্ধ
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা (মঙ্গলবার, ১৪ই এপ্রিল ২০২৬):
অপরিশোধিত জ্বালানি তেল না থাকায় দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসি লিমিটেড (ইআরএল)-এর পরিশোধন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে।
রোববার বিকেলে শেষবারের মতো উৎপাদন করার পর কার্যক্রম স্থগিত করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
বিপিসি সূত্রে জানা গেছে, দেশে সবশেষ অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের চালান আসে ১৮ই ফেব্রুয়ারি। টানা ৫৪ দিন কোনো অপরিশোধিত তেল দেশে আসেনি।
ইআরএল সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর গত প্রায় দুই মাস দেশে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি কার্যত বন্ধ। এতে কাঁচামালের অভাবে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি।
জ্বালানি বিভাগ বলছে, দেশে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুদ থাকায় সরবরাহ ব্যবস্থায় তাৎক্ষণিক কোনো প্রভাব পড়বে না।
তবে ইআরএল দীর্ঘ দিন বন্ধ থাকলে সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
তলানি মজুদে উৎপাদন চেষ্টা:
উৎপাদন সচল রাখতে শেষ পর্যায়ে মহেশখালীর সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) পাইপলাইনে জমে থাকা প্রায় পাঁচ হাজার টন এবং ট্যাংকের তলানিতে জমে থাকা (ডেডস্টক) তেল ব্যবহার করা হয়। সাধারণত এই তলানি সরাসরি ব্যবহার করা ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ এতে ময়লা ও বর্জ্য জমে থাকে।
ডেডস্টকের তেলে থাকা বর্জ্য পাম্পে আটকে যেতে পারে, এতে যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই এটি দীর্ঘ সময় ব্যবহার করা নিরাপদ নয়।
ট্যাংকের তলানির ব্যবহারযোগ্য সীমা ১ দশমিক ৫ মিটার হলেও তা রোববার এক মিটারের নিচে নেমে আসে। ফলে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া আর সম্ভব হয়নি।
আগেই কমানো হয় উৎপাদন:
ইআরএল সাধারণত প্রতিদিন গড়ে সাড়ে চার হাজার টন অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করে। তবে সংকট শুরুর পর গত মাস থেকেই উৎপাদন কমিয়ে দৈনিক সাড়ে তিন হাজার টনে নামিয়ে আনা হয়। সবশেষ পর্যায়ে ব্যবহারযোগ্য মজুত দুই হাজার টনের নিচে নেমে যায়।
বিকল্প পথে নতুন চালান:
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, সৌদি আরামকোর কাছ থেকে এক লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে। এ জন্য ঋণপত্র খোলা হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দর থেকে ২১শে এপ্রিল চালানটি জাহাজীকরণের কথা আছে। এই চালান পারস্য উপসাগর এড়িয়ে সরাসরি আরব সাগর হয়ে মে মাসের প্রথম সপ্তাহে দেশে পৌঁছাতে পারে বলে জানা গেছে।
ইআরএলে মূলত সৌদি আরবের ‘অ্যারাবিয়ান লাইট’ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের ‘মারবান’ পরিশোধন করা হয়। মালয়েশিয়াভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এক লাখ টন পরিশোধিত তেল কেনার প্রস্তাব অনুমোদন করেছে, তবে এর ব্যয় এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
মজুদ পরিস্থিতি:
বিপিসি জানিয়েছে, দেশে বছরে ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়। এর মধ্যে প্রায় ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল, যা ইআরএলে পরিশোধন করা হয়। বাকি প্রায় ৪৫ লাখ টন পরিশোধিত তেল সরাসরি আমদানি করা হয় মধ্যপ্রাচ্য, ভারত, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, চীনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে।
মার্চ মাসে চট্টগ্রাম বন্দরে ১৭টি জাহাজে বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি তেল আসে। এর মধ্যে মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর থেকে দুই লাখ ৩১ হাজার টনের বেশি ডিজেল আমদানি করা হয়। এপ্রিলেও কয়েকটি চালান এসে পৌঁছেছে।
তাৎক্ষণিক সংকট নেই:
জ্বালানি বিভাগ থেকে জানানো হয়েছে, ইআরএলের উৎপাদন বন্ধ হলেও আপাতত জ্বালানি সরবরাহে কোনো বড় ধরনের সংকট তৈরি হবে না। কারণ, যুদ্ধ শুরুর পর বেশি দামে হলেও সরকার আগাম পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি বাড়িয়ে মজুদ নিশ্চিত করেছে।