গ্যাসের ‘অস্বাভাবিক’ মূল্য বাড়াবে শ্রমিক অসন্তোষ, আশঙ্কা বিজিএমইএর
গ্যাসের ‘অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির’ কারণে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়া এবং এর প্রভাবে শ্রমিক অসন্তোষসহ ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির’ আশঙ্কা দেখছে রপ্তানিকারকদের সবচেয়ে বড় সংগঠন বিজিএমইএ।
এভাবে এক লাফে না বাড়িয়ে প্রয়োজনে ধাপে ধাপে সহনীয় পর্যায়ে দাম বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে সংগঠনটি।
বুধবার প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী ও প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের কাছে পৃথক চিঠিতে এমন শঙ্কার কথা তুলে ধরেছেন তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র সভাপতি ফারুক হাসান।
জ্বালানি বিভাগ গত ১৮ জানুয়ারি এক প্রজ্ঞাপনে শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বাণিজ্যিক খাতে গ্যাসের দাম সর্বোচ্চ ১৭৮ শতাংশ বাড়ানোর ঘোষণা দেয়, যা আসছে ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হবে। এবার প্রতি ইউনিটে সর্বোচ্চ ১৯ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
এর আগে ২০২২ সালের ৫ জুন পাইপলাইনে সরবরাহ করা প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের পাইকারি দাম ৯ টাকা ৭০ পয়সা থেকে ২২ দশমিক ৭৮ শতাংশ বাড়িয়ে ১১ টাকা ৯১ পয়সা করা হয়। তখন বাসাবাড়িতে চুলার গ্যাসের দাম বাড়ানো হলেও সবশেষ দফায় এ খাতে ও সিএনজির দাম বাড়ানো হয়নি।
সবশেষ মূল্যবৃদ্ধিকে অস্বাভাবিক আখ্যা দিয়ে বিজিএমইএর চিঠিতে বলা হয়, এ মূল্যবৃদ্ধির কারণে অভ্যন্তরীণ বাজারে ইতোমধ্যেই কাঁচামালের মূল্য বেড়েছে। একইসঙ্গে পোশাক উৎপাদন খরচও বেড়েছে। এতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে গেছে; প্রতিযোগীতায় টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংক ঋণের সুদের হারও বেড়ে গেছে এবং আরও বাড়বে।
“ফলশ্রুতিতে তৈরি পোশাক শিল্পকে টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের কারণে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম অত্যাধিক বৃদ্ধি এবং এর ফলে শ্রমিকরা চরম দুর্ভোগে পড়বে। শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হবে। এতে করে সামগ্রিকভাবে আইনশৃঙখলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটার আশংকা রয়েছে,” সতর্ক করা হয় এ চিঠিতে।
দেশের সবচেয়ে বেশি শ্রমিক কাজ করেন পোশাক শিল্পে। এ খাতে ৫০ লাখেরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে। শুধু তৈরি পোশাক থেকে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮৩ শতাংশ আসে। এর বাইরে হোম টেক্সটাইল, টেরিটাওয়েল, বস্ত্রসহ পোশাক সংশ্লিষ্ট অন্যান্য খাত মিলিয়ে রপ্তানির ৮৮ শতাংশ আসে এ খাত থেকে।
বিজিএমইএর ভাষ্য, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেশের প্রায় চার কোটি মানুষ পোশাক শিল্পের উপর নির্ভরশীল।
গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির বিকল্প হিসেবে সিস্টেম লস শূন্যের কোটায় নিয়ে আসা, মিটার রিডিংয়ে দুর্নীতি বন্ধ করা, অবৈধ সংযোগ বন্ধ করাসহ এ ধরনের অনিয়ম বন্ধ করে খরচ কমিয়ে আনার পরামর্শ দেন ব্যবসায়ী নেতারা।
এছাড়া বৈশ্বিক সংকটের মধ্যে আগামী এক বছরের জন্য আমদানি করা জ্বালানি পণ্যে কাস্টমস শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহারেরও অনুরোধ জানান তারা।
সরকার তিনটি পদ্ধতির মাধ্যমে গ্যাস সংগ্রহ করে বিপণন করে থাকে। নিজেদের গ্যাসক্ষেত্র থেকে প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলনের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদী চুক্তিভিত্তিতে এলএনজি আমদানি এবং আন্তর্জাতিক খোলা বাজার থেকে কেনা এলএনজি দিয়ে চাহিদা মিটিয়ে থাকে।
বিজিএমইএর চিঠিতে দাবি জানানো হয়, এ তিনটির সমন্বয়ের মাধ্যমে গ্যাসের মূল্য নির্ধারণ করা হোক। বর্তমান অর্থনৈতিক মন্দা পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে একসঙ্গে এত মূল্যবৃদ্ধি না করে ক্রমান্বয়ে সহনীয় পর্যায়ে বাড়ানোর পরামর্শ সংগঠনটির।
মূলত ভর্তুকি দেওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতেই সম্প্রতি কাছাকাছি সময়ে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পথে হেঁটেছে সরকার।
তবে একসঙ্গে গ্যাসের দাম অনেক বাড়িয়ে দেওয়ার ফলে শুধু ভর্তুকি থেকে বের হওয়ার পথ সুগম হল না কি লাভের পরিস্থিতি তৈরি হল- তা দাম বাড়ানো পরবর্তী ব্যাখ্যায় স্পষ্ট করেনি মন্ত্রণালয়।
২০২১-২০২২ অর্থবছরে সরকার দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি অনুযায়ী, ওমান ও কাতার থেকে ৫৬ কার্গো এলএনজির পাশাপাশি খোলাবাজার থেকে ১৮টি কার্গো এলএনজি কিনেছিল। তবে ২০২২-২৩ অর্থবছরে এখন পর্যন্ত উচ্চমূল্য ও ডলার সংকটের কারণে খোলাবাজার থেকে এলএনজি কেনা হয়নি।