পাইকারি বিদ্যুতের দাম ইউনিট প্রতি ৩০ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাব
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা (বুধবার, ২০শে মে ২০২৬):
প্রতি ইউনিট পাইকারি বিদ্যুতের দাম ১ টাকা ২০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)।
বর্তমানে প্রতি ইউনিট পাইকারি বিদ্যুতের দাম ৭ টাকা ৪ পয়সা হলেও গত অর্থবছরে গড় উৎপাদন ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১৩ টাকা ১৯ পয়সা। ফলে প্রতি ইউনিটে ৫ টাকা ৪৭ পয়সা লোকসান হচ্ছে। এতে বছরে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা সরকার ভর্তুকি দিয়ে সমন্বয় করছে।
একইসঙ্গে বিদ্যুৎ সঞ্চালন চার্জও বাড়াতে চায় পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি। বিদ্যুৎ সঞ্চালনকারী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি বর্তমানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য ৩০ পয়সা সঞ্চালন চার্জ নেয়। প্রতিষ্ঠানটি তা বাড়িয়ে ৪৯ পয়সা করার প্রস্তাব দিয়েছে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) আয়োজিত বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের উপর গণশুনানিতে পিডিবি এই প্রস্তাব উপস্থাপন করে।
বুধবার রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ মিলনায়তনে গণশুনানি হয়।
শুনানিতে রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী, ভোক্তা অধিকার সংগঠন ও বিভিন্ন অংশীজন বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেন।
পিডিবি প্রস্তাবে জানায়, বর্তমানে প্রতি ইউনিট পাইকারি বিদ্যুতের দাম ৭ টাকা ৪ পয়সা হলেও গত অর্থবছরে গড় উৎপাদন ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১৩ টাকা ১৯ পয়সা। ফলে প্রতি ইউনিটে ৫ টাকা ৪৭ পয়সা লোকসান হচ্ছে। এতে বছরে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা সরকার ভর্তুকি দিয়ে সমন্বয় করছে।
পিডিবি জানায়, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় লোকসান আরও বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রভাবেও চলতি অর্থবছরে ঘাটতি ৬৩ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।
পিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম বলেন, প্রস্তাবিত হারে দাম বাড়ালেও ভর্তুকি পুরোপুরি বন্ধ হবে না। তবে সরকারের ভর্তুকির চাপ ২০ থেকে ২৫ শতাংশ কমবে।
বিইআরসির কারিগরি মূল্যায়ন কমিটির তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যুতের ভর্তুকি পুরোপুরি তুলে দিতে হলে পাইকারি দাম প্রায় ৭৭ শতাংশ বাড়াতে হবে।
পিডিবি বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কিনে তা বিতরণ কোম্পানিগুলোর কাছে পাইকারি দরে বিক্রি করে। সেই বিদ্যুৎ পরে গ্রাহক পর্যায়ে বিক্রি করে বিতরণ কোম্পানিগুলো। ফলে পাইকারি দাম বাড়লে খুচরা পর্যায়েও বিদ্যুতের দাম বাড়বে।
বিদ্যুৎ সঞ্চালনকারী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি বর্তমানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য ৩০ পয়সা সঞ্চালন চার্জ নেয়। প্রতিষ্ঠানটি তা বাড়িয়ে ৪৯ পয়সা করার প্রস্তাব দিয়েছে।
সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুর রশিদ খান বলেন, বিদ্যুৎ সরবরাহ সক্ষমতা বাড়াতে বিপুল বিনিয়োগ করা হলেও প্রত্যাশিত হারে বিদ্যুৎ সঞ্চালন হচ্ছে না। একইসঙ্গে ডলারের দাম বৃদ্ধি ও ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপের কারণে প্রতিষ্ঠানটি গত তিন বছর ধরে লোকসানে রয়েছে। বর্তমানে তাদের ঋণের পরিমাণ প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকা।
তবে বিইআরসির কারিগরি কমিটি বলছে, প্রস্তাবিত হারের তুলনায় কিছুটা কমিয়ে ইউনিটপ্রতি সঞ্চালন ব্যয় ৪৪ পয়সার কাছাকাছি নির্ধারণ করা যেতে পারে।
গণশুনানিতে অংশ নিয়ে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) এর সাংগঠনিক সম্পাদক ড. সৈয়দ মিজানুর রহমান বলেন, বিদ্যুৎখাতের লুটপাটের দায় জনগণের ওপর চাপানো হচ্ছে। বিইআরসি মানুষের পক্ষ না নিয়ে অবৈধ প্রস্তাবদাতাদের পক্ষ নিচ্ছে।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, প্রতিবার শুনানি হয়, তারপর দাম বাড়ানো হয়। এই শুনানি এখন লোক দেখানো প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে। বিদ্যুতের দাম বাড়লে শিল্প উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, অর্থনীতিতে ভয়াবহ প্রভাব পড়বে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)-এর নেতা জালালুদ্দিন বলেন, রপ্তানি এমনিতেই নিম্নমুখী। এখন বিদ্যুতের দাম বাড়লে শিল্প খাতের ওপর চরম চাপ তৈরি হবে।
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, সব পক্ষের মতামত নেওয়া হয়েছে। কারিগরি মূল্যায়নের ভিত্তিতে কমিশন বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নেবে।
আগামী ২৩শে মে পর্যন্ত যে কেউ লিখিতভাবে মতামত জমা দিতে পারবেন।