গ্রামে লোডশেডিংয়ের অভিযোগ সংসদে, মন্ত্রী বললেন ‘ঘাটতি নেই’

নিজস্ব প্রতিবেদক/বিডিনিউজ, ঢাকা (রোববার, ৭ই জুন ২০২৬): 

গ্রামাঞ্চলে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ জাতীয় সংসদে উঠলেও দেশে বর্তমানে বিদ্যুতের কোনো ঘাটতি নেই বলে দাবি করেছেন বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।

রোববার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনের প্রথম দিনের প্রশ্নোত্তর পর্বে দেশের জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী।

যশোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ গোলাম রসুল অভিযোগ করেন, গ্রামাঞ্চলে এখনও পাঁচ থেকে সাত ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। নওয়াপাড়া শিল্পাঞ্চলেও বিদ্যুৎ সংকট রয়েছে।

জবাবে বিদ্যুৎ মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে এখন কোনো বিদ্যুতের ঘাটতি নাই। ঝড়-বৃষ্টি, গাছ পড়ে লাইন ছিঁড়ে যাওয়া কিংবা সঞ্চালন ও বিতরণ লাইনের ত্রুটির কারণে সাময়িক বিদ্যুৎ বিভ্রাট হতে পারে, তবে সেটাকে লোডশেডিং বলা ঠিক নয়। লোডশেডিং হলো বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎ না থাকা। বিদ্যুতের বাংলাদেশে এখন কোনো ঘাটতি নাই।

কুমিল্লা-৯ আসনের সংসদ সদস্য আবুল কালামের এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, গ্রীষ্ম ও সেচ মৌসুমে দেশে দৈনিক বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা প্রায় ১৮ হাজার মেগাওয়াট।

তিনি বলেন, চাহিদা অনুযায়ী বর্তমানে বিদ্যুতের কোনো ঘাটতি না থাকলেও গ্রীষ্মকালে সর্বোচ্চ চাহিদার সময় বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রাথমিক জ্বালানির ঘাটতি, সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা, রক্ষণাবেক্ষণ ও ঝড়-বৃষ্টির কারণে মাঝে মাঝে কিছুটা বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটে।

ঢাকা-১ আসনের সংসদ সদস্য খোন্দকার আবু আশফাকের প্রশ্নের জবাবে টুকু জানান, বর্তমানে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ১৬ হাজার ৫০০ থেকে ১৭ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের মধ্যে ওঠানামা করছে। এর বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে ১৫ হাজার ৫০০ থেকে ১৭ হাজার ২০০ মেগাওয়াট।

উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট

সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নিলুফার চৌধুরী মনির প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, দেশের গ্রিডভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট।

তিনি জানান, বর্তমানে ৭ হাজার ৯২৮ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতার ৩২টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণাধীন রয়েছে।

এছাড়া ৬৬৫ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতার ১৫টি নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দরপত্র প্রক্রিয়া চলছে। সেগুলো ২০৩০ সালের মধ্যে পর্যায়ক্রমে চালু হবে।

মন্ত্রী বলেন, দেশের শতভাগ জনগোষ্ঠীকে বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আনা হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্মত বিদ্যুৎ সুবিধা নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে।

গ্যাসের অভাবে বন্ধ যমুনা সার কারখানা

প্রশ্নোত্তর পর্বে জামালপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য ফরিদুল কবির তালুকদারের প্রশ্নের জবাবে শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে যমুনা সার কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, গ্যাস প্রাপ্তি সাপেক্ষে এটি চালু করতে কোনো সমস্যা নেই।

১২টি রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প কারখানা বন্ধ

জামালপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলের প্রশ্নের জবাবে শিল্পমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে দেশে ১২টি রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প কারখানা বন্ধ রয়েছে। এছাড়া ছয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলে আখ মাড়াই কার্যক্রম স্থগিত আছে।

চট্টগ্রামের শিল্প পরিস্থিতি নিয়ে বিএনপির সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজামের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিসিকের পাঁচটি শিল্পনগরীতে গত ১৭ বছরে ৪৩টি শিল্প কারখানা বন্ধ হয়েছে।

সতর্ক থাকার পরামর্শ স্পিকারের

আশুগঞ্জ সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহ চালুর বিষয়ে সংসদে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হওয়ায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদকে ভবিষ্যতে আরও সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার এক সম্পূরক প্রশ্নের পর এ মন্তব্য করেন স্পিকার।

রুমিন ফারহানা বলেন, আমরা লোডশেডিং বলি আর মেরামত শেডিংই বলি, গ্রামাঞ্চলে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। এটাই হলো বাস্তবতা।

জবাবে জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না, এটার সঙ্গে আমি একমত না।

তিনি বলেন, উনি বিদ্যুৎ চাচ্ছেন আবার উনার ফার্টিলাইজার ফ্যাক্টরিও চালাতে বলছেন। গ্যাসের তো আমার সংকট আছে। সেজন্য আমাদের বিদ্যুৎ প্ল্যান্টগুলো চালিয়ে রাখতে হচ্ছে। সেইজন্য তার ওখানে সংযোগ দিতে পারছি না।

গ্যাসের সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হলে আশুগঞ্জে সরবরাহ দেওয়া হবে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, গত ১৭ বছরে কোনোদিন ড্রিলিং করা হয় নাই। আমরা এই প্রথম এসে ড্রিলিং শুরু করেছি। আমরা আশা করি ইনশাআল্লাহ গ্যাস পাব। গ্যাস পাওয়ার পরে আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজারসহ যত ফার্টিলাইজার ফ্যাক্টরি আছে সবগুলোতে সংযোগ দিতে পারব।

মন্ত্রীর বক্তব্যের পর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ তাকে আগের প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দেন।

তিনি বলেন, মাননীয় মন্ত্রী, আপনি কিন্তু সংসদে বলেছিলেন এক তারিখ থেকে গ্যাস যাবে। সেটি বোধহয় পাওয়া যায়নি।

পরে মন্ত্রীদের উদ্দেশে স্পিকার বলেন, সংসদে যে প্রতিশ্রুতি দিবেন, সেটা ড্রিলিং বা অন্যান্য যাবতীয় আনুষঙ্গিক বিষয় স্টাডি করে তারপরে সংসদে প্রতিশ্রুতি দিবেন।