বিদ্যুতের দাম বেড়েছে: কোন গ্রাহকের মাসে কত বাড়তি খরচ হবে?
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা (বৃহস্পতিবার, ৪ঠা জুন ২০২৬):
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নতুন সিদ্ধান্তে আবাসিক, কৃষি, শিল্প, বাণিজ্যিক ও অন্যান্য সব শ্রেণির গ্রাহকের বিদ্যুতের দাম বেড়েছে। মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা সাধারণ মানুষের জন্য এই মূল্যবৃদ্ধি মাসিক ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
নতুন ট্যারিফ অনুযায়ী প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম বিভিন্ন শ্রেণিতে ৬৯ পয়সা থেকে ৩ টাকা ৬৪ পয়সা পর্যন্ত বেড়েছে। ফলে গ্রাহকের ব্যবহৃত ইউনিটের পরিমাণ অনুযায়ী মাসিক বিলও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে।
আবাসিক গ্রাহকদের বাড়তি খরচ কত?
দাম বৃদ্ধির ফলে কম বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী গ্রাহকদের মাসিক অতিরিক্ত ব্যয় তুলনামূলক কম হলেও মধ্যম ও উচ্চ ব্যবহারকারীদের ওপর চাপ বেশি পড়বে। তবে কম ইউনিট ব্যবহার করলে সেই অনুযায়ী বিল কম হবে।
০-৫০ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারীর ৬৯ পয়সা বেড়েছে। তাহলে মাসে এই শ্রেণির গ্রাহকের সবোর্চ্চ খরচ বাড়বে ৫০×.৬৯=৩৪.৫০ টাকা। মাসে মোট দিতে হবে ২৬৬ টাকা। একইভাবে ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহার করলে প্রতি ইউনিটে খরচ বাড়বে ৯২ পয়সা অর্থাৎ মাসে খরচ বাড়বে ৬৯ টাকা। আর মোট বিল দিতে হবে ৪৬৩ টাকা ৫০ পয়সা।
বিদ্যুতের ৭৬-২০০ ইউনিট, ২০১-৩০০ ইউনিট এবং ৩০১-৪০০ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহার করা গ্রাহক সবচেয়ে বেশি।
২০০ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারী একটি পরিবারের আগের মাসের চেয়ে অতিরিক্ত খরচ হবে প্রায় ২৬০ টাকা। বিদ্যুতের জন্য মোট দিতে হবে ১ হাজার ৭০০ টাকা।
৪০০ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারী গ্রাহকের ক্ষেত্রে বাড়তি দিতে হবে ৬৪০ টাকা। মোট দিতে হবে ৩ হাজার ৮৪৮ টাকা।
৬০০ ইউনিট ব্যবহারকারী পরিবারের অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়াবে ১ হাজার ৪০৪ টাকা। মাসে মোট খরচ হবে ৯ হাজার ৬ টাকা।
বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির কারণে পরিবারগুলোর মাসিক ব্যয় আরও বাড়বে। বিশেষ করে নির্দিষ্ট আয়ের মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে অতিরিক্ত আর্থিক চাপের মুখে পড়তে হবে। পাশাপাশি বিদ্যুতের দাম বাড়ার প্রভাব বিভিন্ন পণ্য ও সেবার উৎপাদন ব্যয়ের ওপরও পড়বে। যা সামগ্রিকভাবে জীবনযাত্রার ব্যয়কে আরও বাড়িয়ে দেবে।
কৃষি খাতে প্রভাব:
সেচ ও কৃষিকাজে ব্যবহার করা বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিটে ৭৯ পয়সা বেড়েছে। ১,০০০ ইউনিট ব্যবহার করলে মাসে অতিরিক্ত খরচ হবে ৭৯০ টাকা; ৫,০০০ ইউনিট ব্যবহার করলে অতিরিক্ত খরচ হবে ৩,৯৫০ টাকা। ফলে সেচ ব্যয় বাড়ার মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন খরচও বাড়লো।
ক্ষুদ্র শিল্পে বাড়তি চাপ:
ক্ষুদ্র শিল্প গ্রাহকদের ক্ষেত্রে— ফ্ল্যাট প্রতি ইউনিট বেড়েছে ১ টাকা ৯৭ পয়সা। অফ-পীক সময়ে একটু কম অর্থাৎ ১ টাকা ৭৭ পয়সা। তবে পীকে বেশি ২ টাকা ৩২ পয়সা।
যদি কোনো ক্ষুদ্র শিল্প প্রতিষ্ঠান মাসে ৫,০০০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করে, তবে ব্যবহারভেদে অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়াতে পারে ৮,৮৫০ থেকে ১১,৬০০ টাকা পর্যন্ত।
নির্মাণ খাতে সর্বোচ্চ চাপ:
নির্মাণ কাজে ব্যবহার করা বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিটে ২.৯৪ টাকা বেড়েছে। ১,০০০ ইউনিট ব্যবহার করলে অতিরিক্ত ব্যয় ২,৯৪০ টাকা; ৫,০০০ ইউনিট ব্যবহার করলে অতিরিক্ত ব্যয় ১৪,৭০০ টাকা। এতে নির্মাণ ব্যয় আরও বাড়তে পারে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে প্রভাব প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ৫০ পয়সা বেড়েছে। ১,০০০ ইউনিট ব্যবহারে অতিরিক্ত ব্যয় ১,৫০০ টাকা, ১০,০০০ ইউনিট ব্যবহারে অতিরিক্ত ব্যয় ১৫,০০০ টাকা। রাস্তার বাতি ও পানির পাম্পের জন্য প্রতি ইউনিটে ১টাকা ৭৫ পয়সা বেড়েছে। এতে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ওয়াসার বিদ্যুৎ ব্যয় বাড়বে, যা পরোক্ষভাবে সেবার খরচেও প্রভাব ফেলবে। চার্জিং স্টেশন পরিচালনাকারীদের বিদ্যুৎ ব্যয় বাড়ায় ইভি চার্জিং খরচও বাড়লো।
বাণিজ্যিক গ্রাহকদের ওপর প্রভাব:
কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান মাসে ১০,০০০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে অতিরিক্ত ব্যয় হবে ২১,১০০ থেকে ২৮,১০০ টাকা পর্যন্ত।
অস্থায়ী সংযোগে সর্বোচ্চ বৃদ্ধি:
অস্থায়ী সংযোগের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিটে ৩.৬৪ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা তালিকাভুক্ত শ্রেণিগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। এই গ্রাহকের ১,০০০ ইউনিট ব্যবহারে অতিরিক্ত ব্যয় ৩,৬৪০ টাকা এবং ৫,০০০ ইউনিট ব্যবহারে অতিরিক্ত ব্যয় ১৮,২০০ টাকা।
সার্বিক মূল্যায়ন:
নতুন বিদ্যুৎ ট্যারিফে আবাসিক থেকে শুরু করে কৃষি, শিল্প, বাণিজ্যিক ও সেবামূলক সব খাতের গ্রাহকদের খরচ বাড়বে। জ্বালানি তেলের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে এই সিদ্ধান্ত যুক্ত হওয়ায় পরিবহন, কৃষি উৎপাদন, শিল্প উৎপাদন ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের ওপরও চাপ বাড়বে। বিশেষ করে নির্ধারিত আয়ের পরিবারগুলোর মাসিক ব্যয় আরও বেড়ে যাওয়ায় সচ্ছল জীবন যাত্রায় শঙ্কা তৈরি হয়েছে।